উদ্যোক্তাদের গল্প

মাতৃত্ব কে প্রাধান্য দিয়ে চাকরি ছেড়ে উদ্যোক্তা হলেন বরিশালের নারী

বরিশালের মেয়ে ইশরাত জাহান রুম্পা, শান্ত মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অফ ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির প্রডাক্ট এন্ড ফ্যাশন মার্চেন্ডাইজিং বিভাগ হতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন। পড়াশোনা শেষ করে তিন বছর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছেন তিনি। মাতৃত্বকে প্রাধান্য দিয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বর্তমানে তিনি “Rumpa’s closet” নামক একটি অনলাইন ভিত্তিক বিজনেস প্লাটফর্মের স্বত্বাধিকারী। প্রজন্ম ২৪ কে রুম্পা তার উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন।

রুম্পা বলেন, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে বিয়ে হয়ে যাওয়া এই আমি বহু চড়াই-উতরাই পার হয়ে একটা বাচ্চা নিয়েও পড়াশুনা শেষ করি। এরপর একটা মাল্টিন্যাশনাল কম্পানিতে প্রায় তিন বছর চাকরি করি। কিন্তু আমার মন ছিল অন্য দিকে, নিজের নামে আলাদা একটা ছাউনি হোক আমার।

বাচ্চার যত্ন ঠিকঠাক নিতে না পারায় নিজেই ঐ লোভনীয় চাকরি টা ছেড়ে দেই কারণ মাতৃত্ব টাকে আমি প্রাধান্য দিয়েছি। আমি সব সময় চাইতাম নিজেকে কি করে আলাদা লাগবে অন্যের চেয়ে। তাই বেশিরভাগ সময়ই নিজের জামাকাপড়, শাড়ি বা ব্লাউজে হাতের কাজ করে, টাই-ডাই করে ভিন্নতা আনতাম। ভাল লাগত আমার এটা করতে। অনেক সময় সিম্পল শাড়িতে কুচি লাগিয়ে আলাদা করে ফেলতাম যা আমার পরিচিত মহলে আমাকে আলাদা করত।অনেক কে ফ্রি ও করে দিতাম।

কিন্তু আমি সব সময় চাইতাম, নিজের নামের একটা ছাউনি হোক আমার। আমার কাজ গুলো অন্যদের দ্বারেও পৌঁছে যাক অনায়াসে।
নিজের নামে ছাউনি হোক সেই চিন্তা থেকেই আমার উদ্যোগ রুম্পা’স ক্লোজেট এর নামকরণ। আমার আলমারি অর্থাৎ রুম্পা’স ক্লোজেট এ ফিউশন মনিপুরী শাড়ি, বাহারী ব্লাউজ রয়েছে।

রুম্পা’স ক্লোজেট এর যাত্রায় আমার পরিবার পরিজনের সাপোর্ট যে খুব বেশি ছিল তা কিন্তু নয়। সবার একটাই কথা চাকরি ছেড়ে দিছি সন্তানের জন্য কিন্তু শাড়ি কাপড় কেন বিক্রি করব? প্রয়োজনে আবার চাকরি কর।
চাকরি টাই তো সম্মানের। অফিসের গাড়ি নিতে আসত আর এখন পায়ে হেটে বা অটো রিক্সা করে কাপড় ডেলিভারি দিতে যাই কুরিয়ারে। এসব কত মুখরোচক কথা।

এসবে আমি ভীত নই কারণ আমার ২২ মাস বয়সি একটা মেয়ে আছে, যাকে আমি ৪ দিন বয়সে হাসপাতাল থেকে একদম একা বাসায় নিয়ে আসছিলাম। দুটো সিজারিয়ান বেবির মা আমি তবুও একদম একা লালনপালন করেছি মেয়েটাকে। আমি যখন ৪ দিনের একটা বাচ্চাকে একা হাতে লালনপালন করতে পেরেছি, তখন আমি এসব কথা সহ্য করে উদ্যোগটা এগিয়ে নিতে পারব, পারব মানে পারবোই।

এসব ছাড়াও অনেক প্রতিকূলতা রয়েছে আমার। বাচ্চাকাচ্চার মা হয়েও টিনএজ দের মত আমি দিন-রাত ২৪ ঘন্টার ২০ ঘন্টা অনলাইনে কেন, কেন আমার হাতে সব সময় ফোন এসব প্রশ্ন প্রতিনিয়তই ফেস করি। অনেকে আবার উদ্ভট মন্তব্য ও করে বসেন, আমি প্রেমে পরিনি তো।

হ্যাঁ আমার ফোন ২০ ঘন্টা আমার হাতেই থাকে আর আমি প্রেম ও করি। তবে আমার প্রেম টা কোনো মানুষের সাথে নয়, আমার স্বপ্ন, আমার নিজের নামের ছাউনি রুম্পা’স ক্লোজেট এর সাথে। অনলাইন জগতে রুম্পা’স ক্লোজেট কে গুছিয়ে নেয়ার লড়াই আমার, তাই আমার ফোন হাতে দিন-রাত কাজ করে যেতে হয়।

আমার ২২ মাস বয়সী কন্যার নাকি যত্ন হয়না ঠিকঠাক সেজন্য ও আমায় নিয়ে চুল চেরা বিশ্লেষণ চলে পরিচিত মহলে অথচ আমি আমি জানি আমার তিন টা সন্তান, আমার ছেলে, মেয়ে আর রুম্পা’স ক্লোজেট। তিন জনের জন্যই আমার সমান যত্ন বা ভালবাসা।

পরিচিতজন দের সাপোর্ট না পেলেও আমি ফেসবুকে এত ভালো একটা প্লাটফর্ম পেয়েছি যেখানে আমার মত হাজারো উদ্যোক্তা ঘুরে দাড়াবার স্বপ্ন সফল করার সহজ উপায় খুঁজে পায়। আমি শুধু নিজের নামের ছাউনি গড়তে, নিজের স্বপ্ন পুরন করতে সেই প্লাটফর্ম এ সময় দিয়েছি, দিচ্ছি দিন রাত।

আমি পারবোই, পারতে আমায় হবেই, এই বিশ্বাস আর সেই প্লাটফর্ম থেকে আরও অনেক মানুষের ঘুরে দাড়াবার গল্প গাথাই আমার এগিয়ে যাবার সম্বল।

আমার এখন একটাই স্বপ্ন, রুম্পা’স ক্লোজেট এর নাম মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে যাবে। আমার করা ফিউশন মনিপুরী বা ডিজাইনার ব্লাউজ রুচিশীল সবার ক্লোজেট বা আলমারি তেও ঠাঁই পাবে। শাড়ি, ব্লাউজের পাশাপাশি চিন্তা ভাবনা হল শুধুমাত্র মা মেয়ের জন্য সেইম শাড়ি বা সেইম হাতের কাজের কম্বো ড্রেস আমি রুম্পা’স ক্লোজেটে রাখব।

রুম্পা’স ক্লোজেট এর সব কাজ আমি একাই করি। তবে মাঝেমধ্যে আমার প্রিয় একজন বান্ধবী আমায় কিছু কিছু বিষয় সাহায্য করে।

মেয়েরা ব্যবসা করবে এটা এখনো আমাদের সমাজ ভালভাবে নিতে পারেনা, খারাপ একটা তকমা জুড়ে দেয় অথচ একটু সাপোর্ট পেলে আমরাও পারি সব করতে। আমার পরিবার বা পরিচিত সার্কেল এ আমিই ব্যতিক্রম যে চাকরি ছেড়ে আর চাকরি না খুঁজে ব্যবসা কে বেছে নিয়েছি। অন্যের অধিনে কাজ না করে বরং নিজেই কিছু মানুষের কর্মসংস্থান এর ব্যবস্থা করে দিব এই ধারণা এখনো শক্তশক্ত পোক্ত হয়নি আমার গন্ডিতে। নারীর ব্যবসা করা অসম্মান এর কিছু নয় বরং সেটা আত্নতৃপ্তির এই বাক্য টা একদিন প্রতিষ্ঠা করার ইচ্ছা আমার।

রুম্পা’স ক্লোজেট এর পণ্য রুচিশীল মানুষ দের ক্লোজেট বা আলমারি তে জায়গা পাবে সেটাই একমাত্র আশা আমার। আমার আরেকটা স্বপ্ন হল, আমার প্রানের শহর বরিশালে রুম্পা’স ক্লোজেট এর প্রথম শো রুম হবে। আমার নিজের ছাউনি টা আমি পাকাপোক্ত করে গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ পরিশ্রম দিয়ে যাব।

ইশরাত জাহান রুম্পা
স্বত্বাধিকারী,
Rumpa’s closet

সম্পর্কিত নিউজ