উদ্যোক্তাদের গল্প

মা-মেয়ের উদ্যোক্তা হওয়ার পেছনের গল্প

চট্টগ্রামের মেয়ে ওয়াজিহা সালসাবিল, পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষে। পড়াশোনার পাশাপাশি মাকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেছেন অনলাইন ভিত্তিক একটি বিজনেস প্লাটফর্ম। প্রজন্ম ২৪ কে ওয়াজিহা তাদের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প পাঠিয়েছেন।

ওয়াজিহা বলেন, ছোটবেলা থেকেই রান্নার প্রতি খুবই আগ্রহী ছিলাম। বিভিন্ন ধরনের বার্থডে কেক, কুকিজ ও ডেজার্ট তৈরির পাশাপাশি নিত্যনতুন নাস্তা এবং বাঙালি, ইতালিয়ান, চাইনিজ বিভিন্ন কুসিনের ফিউশন করতে খুবই ভাল লাগে। রান্নায় নতুন নতুন সৃষ্টি আনাটা যেন আমার নিত্যদিনের সঙ্গী।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর ফেসবুকে নিজের প্রোফাইলে বিভিন্ন ধরণের খাবার তৈরি করে ছবি দিতাম। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনরা, সকলে অনেক প্রশংসা করত। ব্যবসার ছিটেফোঁটা না জানা আমি নিজেই সাহস যুগিয়ে কিছু কাছের মানুষ, বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের মাঝে কেক বিক্রি শুরু করি। তখন মাসে ২/৩ টা কেক এর অর্ডার পেতাম। এরপর পরিচিতি বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে ফেসবুক পেজ খুলার চিন্তা করি।

“চেরি অন টপ” দিয়েই আমার স্বপ্নের যাত্রা শুরু করলাম। প্রথম ডেলিভারি দিলাম নিজেরই মেডিকেলের এক ফ্রেন্ডের ব্রাইডাল শাওয়ার অনুষ্ঠানে। এরপর দিলাম এক হলুদ অনুষ্ঠানে। এভাবে আস্তে আস্তে আমার স্বপ্নের কলি ফুটতে শুরু করল। সবার ভালোবাসা ও সহযোগিতা আমার আত্মবিশ্বাস কে আরো বাড়িয়ে দেয়। এরপর পেইজে কেক ও ডেজার্টের পাশাপাশি পিৎজা, পাস্তা, চাইনিজ, ইতালিয়ান, ইন্ডিয়ান কুসিন ও ফ্রজেন আইটেম ও যোগ করলাম।অনেকে আমাকে জিজ্ঞেস করে। মেডিকেলে এত পড়ার চাপে কিভাবে এসব ম্যানেজ করি। আমি বিশ্বাস করি কঠোর পরিশ্রম করলে সবই সম্ভব। তবে তার পিছনে থাকতে হবে প্রবল ইচ্ছা শক্তি ও ধৈর্য। তবে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা করা মোটেও সহজ কাজ নয়।

লকডাউনে ঘরে বন্দি অবস্থা যেন অনলাইন ব্যবসায়ীদের জন্য নিজের ব্যবসা প্রসারের এক অনন্য সুযোগ। তাই আমিও এই সুযোগকে কাজে লাগিয়েছি। মা যেহেতু আগে থেকেই রান্নায় অনেক ভালো, আর আমার কিছু পার্মানেন্ট কাস্টমারের ডিমান্ডে ও বাবার উৎসাহে পেইজে নতুন যোগ করলাম মায়ের রান্না। সুলতানা শাহেনাজ পিঠাপুলি ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী খাবার মোচা। বিভিন্ন ধরনের পিঠাপুলী দিয়ে রেখেছি পিঠা প্লেটার। পাশাপাশি রাখলাম পর্দা বিরিয়ানি।

বর্তমানে মা ও মেয়ের এই যুগলবন্দি সবার প্রশংসায় সিক্ত। আমাদের এই হোমমেড খাবারের ব্যবসা আল্লাহ তায়ালার রহমতে বর্তমানে অনেক ভালো চলছে আলহামদুলিল্লাহ। সবার কাছে ভেজালহীন স্বাস্থ্যকর ঘরোয়া পরিবেশে তৈরিকৃত হালাল খাবার পৌঁছে দিতে পেরে আমরা মা-মেয়ে অনেক খুশি। পাশাপাশি পাচ্ছি সকলের দোয়া ও ভালোবাসা। তবে এতকিছুর মধ্যেও অনেক প্রতিবন্ধকতা ও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে নিজেকে। যেহেতু খাবারের আইটেমের ব্যবসা তাই যথাযথ সময়ে কাস্টমারের কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়া এবং ঠিকভাবে প্যাকেজিং এর একটা বড় দায়িত্ব থাকে সবসময়। অনেক সময় দেখা যায় ডেলিভারি ম্যান যথাসময়ে আসেনা তখন নিজেকে ডেলিভারি দিতে হয়। আবার কেক ডেলিভারি যেহেতু অনেক রিস্কি, ডিজাইন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাই কেক ডেলিভারি আমি নিজেই দিয়ে থাকি। তবে এই সকল প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হবে সেটাই আমাদের বিশ্বাস।

নিজেই বাজার করা থেকে শুরু করে খাবার বানানো, যথাযথ প্যাকেজিং ও মাঝে মধ্যে ডেলিভারি এই সবকিছু শেষ করে দিন শেষে যখন ইনবক্সে কাস্টমারদের ভালো ভালো মেসেজ, রিভিউ পাই তখন মা ও মেয়ের সারাদিনের কষ্ট সার্থক বলে মনে হয়। খাবারের মান ঠিক রেখে ন্যায্যমূল্যে খাবার সরবরাহ করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। আমাদের এই ছোট ব্যবসায়ী সব সময় পাশে পেয়েছি আমার বাবা ডা. এম এ তাহের কে। চিকিৎসক বাবা সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বাসায় ফিরে মেয়ের পেইজের পোস্ট শেয়ার করতে কখনোই ভুলেন না। তাছাড়া ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের অনেক সহযোগিতা পেয়েছি। আমি সারা জীবন তাদের সবার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ থাকব। ভবিষ্যতে ভাল চিকিৎসক হওয়ার পাশাপাশি “চেরী অন টপ” দিয়ে সকলের মাঝে পরিচিতি হওয়ার স্বপ্ন দেখি। আমার এই ছোট্ট ব্যবসাকে ভবিষ্যতে অনেকদূর নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। আশা করি সবাই আমার এই স্বপ্ন পূরণে অনেক অনেক দোয়া ও সহযোগিতা করবেন। আপনাদের দোয়া থাকলে একদিন এই স্বপ্নপূরণে সফল হবোই ইনশাআল্লাহ।

ওয়াজিহা সালসাবিল ও

সুলতানা শাহেনা জাহান লাকী

স্বত্বাধিকারী,

“চেরী অন টপ”

সম্পর্কিত নিউজ