অর্থনীতি

মাইক্রোসফট এর বিরুদ্ধে অনাস্থা মামলা এবং ইভ্যালির জন্য শিক্ষা

ইন্টারনেটের জন্মলগ্ন সময়কাল ১৯৯৮। পার্সোনাল কম্পিউটারের বাজারে মাইক্রোসফট এর আধিপত্য ছড়িয়ে পড়ে বেশ ভালোভাবে। শতকরা ৯০ শতাংশ কম্পিউটার চলতো উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম এ। উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের সাথে ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার নামক ইন্টারনেট ব্রাউজার আসতো বিল্ট ইন, তাও বিনামূল্যে। অধিকাংশ গ্রাহক অন্য ব্রাউজার ইন্সটল করা প্রয়োজন মনে করতো না। সংখ্যাটি যখন সর্বমোট কম্পিউটার ব্যবহারকারীর ৯০ শতাংশ তখন বাকীদের জন্য বাজারে টিকে থাকা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলাফল, মাইক্রোসফট এর বিরুদ্ধে অনাস্থা মামলা। তৎকালীন ব্যবসায়ীক প্রতিপক্ষ নেটস্কেপ ইন্টারনেট ব্রাউজার এর অভিযোগের প্রেক্ষিতে বিচার বিভাগীয় মামলা হয়। ১৯৯৮ সালের ২৭ অগাস্ট, মাইক্রোসফট এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান বিল গেটস এর মুখোমুখি হয় মার্কিন বিচার বিচার বিভাগ।

পতনের একদম শেষপ্রান্তে চলে গিয়েছিলো মাইক্রোসফট। মাইক্রোসফট এর ফিরে আসা এবং এ থেকে ইভ্যালির শিক্ষা নিয়ে বলবো আজ।

সময়কাল ২০১৮

নভেম্বর নাগাদ আমাদের দেশীয় রাইড শেয়ারিং স্টার্টাপ পাঠাও এর বিরুদ্ধে গ্রাহকের তথ্য নিরাপত্তা প্রদানে ব্যার্থতার অভিযোগ উঠে আসে। পাঠাও তার গ্রাহকদের সকল তথ্য যেমন লোকেশন, এস এম এস, কন্টাক্ট, ইমেইল সব তাদের ক্যালিফোর্নিয়ার সার্ভারে জমা করছিলো। ব্যাপারটা গুরুতর কারন, ব্যাংক, বিকাশ সবকিছুর ওটিপি, কনফার্মেশন ইমেইল অন্য কারো কাছে চলে যাক তা আপনি আমি কেউই চাইবো না। এবং পাঠাও সেটা করতো প্রতিবার এপ চালু করা মাত্রই।

সঠিক নীতিমালার অভাবে পার পেয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু ২০১৭ এর রাইড শেয়ারিং নীতিমালা অনুযায়ী পাঠাওকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়।

সময়কাল ২০১৯

এমাজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ লেগেই থাকে। সম্প্রতি একটি অভিযোগ এমাজানের ব্যবসার ভিত্তি নাড়িয়ে দিচ্ছে।

শুধু এমাজান নয়, গুগল, ফেসবুক এবং এপল সবার বিরুদ্ধে অনাস্থা মামলা হয় ইউরোপ এবং আমেরিকার আদালতে।

আমরা গুগল, ফেসবুকইউটিউবহোয়াটসএপ কিছুই টাকা দিয়ে ব্যবহার করি না। টাকা না দিতে হলেও মূল্য পরিশোধ করতেই হয়। আমরা আমাদের নাড়ির খবর নেওয়ার এখতিয়ার দিয়ে রেখেছি এদের। কিছু পেতে হলে কিছু দিতে হয়, আমরা অনেক খানি দিয়ে বসে আছ নিজেদের অজান্তে। এ এক আধুনিক বিনিময় প্রথা।

গুগল এবং ফেসবুকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা লোকের এসকল তথ্য বিজ্ঞাপনদাতাদের সরবরাহ করে। ফলে মানুষের প্রাইভেসির পিন্ডি চটকে যায়। আমি ফেসবুক মেসেঞ্জারে বন্ধুকে পিজ্জা খাওয়াতে বলামাত্রই ফেসবুক আমাকে সারাদিন পিজ্জার বিজ্ঞাপন দেখাবে। মানে মেসেঞ্জারের ব্যক্তিগত আলাপেও কান পেতে থাকে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স। হয়তো আমি গুগল ম্যাপ এ শিশু পার্ক যাবো বলে পথনির্দেশ চাইলাম, ও ব্যাটা আমাকে সারাদিন ফ্যান্ট্যাসি কিংডম এর বিজ্ঞাপন দেখিয়ে বেড়াবে।

এপলের বিরুদ্ধে অভিযোগ, কেউ যদি এপস্টোরে আপ্লোড করা কোন এপের মাধ্যমে কিছু বিক্রি করতে চায়, তাহলে সেটা এপল পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমেই করতে হবে। ফলে এপ পাবলিশাররা বাধ্য হচ্ছে এপল পেমেন্ট গেটওয়ে ব্যবহার করতে এবং ইন এপ পার্চেজে এপলকে কমিশন দিতে। গুগল প্লেস্টোরের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আছে লভ্যাংশের শতকরা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কেটে নেওয়ার।

এমাজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। বলা হচ্ছে, এমাজান তার ওয়েবসাইটে কাস্টমার ডেটা এনালাইসিস করে সফলতম প্রোডাক্টগুলো চিহ্নিত করে। এরপর নিজেদের ব্র্যান্ডের আওতায় সেসব প্রোডাক্ট বাজারে আনে, সাথে থাকে আগ্রাসী ডিসকাউন্ট। ফলে একই প্রোডাক্ট আগে থেকে বিক্রি করতে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ বাজারে টিকতে পারে না।

সময়কাল ২০২০

গতকাল মানে ২৭ অগাস্ট এমাজান ইন্ডিয়ার জন্য মোটামুটি চাপের। হাজার দুয়েক খচরা বিক্রেতা মিলে একটি অনাস্থা মামলা ঠুকে দিয়েছে। অভিযোগ, এমাজানের অতি ডিসকাউন্ট পলিসি বাজারে ক্ষুদ্র ই-কমার্স সাইটগুলো টিকে থাকার জন্য বিশাল হুমকি। জোরেসোরেই এমাজানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে ইন্ডিয়ান কম্পিটিশন কমিশন। ভারতীয় কম্পিটিশন কমিশন আইন অনেকটা আমাদের দেশের ভোক্তা অধিকার আইনের মতো, কিন্তু, এটার কাজ বিক্রেতাদের অধিকার নিশ্চিত করা।

এমাজানের বিরুদ্ধে ২০১৯ সাল থেকে আমেরিকার সিয়াটলে চলে আসা অনাস্থা মামলার পালে নতুন করে দম দিলো ভারতীয় এই মামলা। এমাজানের পাশাপাশি ওয়ালমার্ট এর মালিকানাধীন ফ্লিপকার্ট এর বিরুদ্ধেও তদন্ত হবে। ই-কমার্সের জন্য ঘোর কলিকাল।

বিদেশী বিনিয়োগকারিদের ব্যাপারে ভারতীয় আইনে বেশ কড়াকড়ি থাকায় এমনিতেই এমাজান এর ফ্লিপকার্টের অবস্থা ত্রাহি মধুসূদন। তার সাথে যোগ হলো আরেক নতুন উৎপাত!

২৭ অগাস্ট, একই দিনে, আমাদের দেশীয় ই-কমার্স স্টার্টাপ ইভ্যালির চেয়ারম্যান এবং এমডির ব্যাংক একাউন্ট জব্দ করা হয়েছে। অভিযোগ, অতিরিক্ত ডিসকাউন্ট অফার করে বাজারের প্রতিযোগীতা নষ্ট করছে

যেহেতু আমাদের এ ধরনের অভিযোগ এর আগে কখনো উঠে আসেনি তাই এই বিষয়ক কোন আইন, নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই, তাই অভিযোগ চলে গেলো অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ে। যেমনটা ঘটেছিলো মাইক্রোসফট এর ক্ষেত্রে, মামলা চলে গিয়েছিল বিচার বিভাগে।

মোদ্দাকথা, এমাজান, ফ্লিপকার্ট, ইভ্যালি এদের সবার বিরুদ্ধে অভিযোগ এরা বাজারে একক আধিপত্য বিস্তার করতে চায়, প্রতিযোগীদের জন্য বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করছে।

বাংলাদেশে আইন ও নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা

আমি আইনের লোক নই, এগুলা বুঝি ও না ভালো। আমার ব্যক্তগত মূল্যায়ন থেকে কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই। ইভ্যালির বিরুদ্ধে মানি লণ্ডারিং এর অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগের প্রেক্ষিতে ইভ্যালির বিরুদ্ধে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে সেটা যুক্তিসংগত। কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক প্রিপেইড কার্ড সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান পেওনিয়ারের সকল কার্ড একাউন্ট সাময়িক জব্দ করা হয়েছিলো। পেওনিয়ারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিলো না। সমস্যা হয়েছিলো পেওনিয়ারের কার্ড পার্টনার ওয়্যারকার্ডের। ওদের সিইওর বিরুদ্ধে প্রায় দুই বিলিয়ন ইউরো তহবিল তছরুপের অভিযোগ উঠে আসে। মানে ওই মানি লন্ডারিং মামলা আরকি। তদন্তের স্বার্থে সকল একাউন্ট জব্দ করা হলেও, দিন তিনেকের মাথায় সেগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়

ইভ্যালির একাউন্টগুলো জব্দ করার ফলে কর্মচারী, ক্রেতা, বিক্রেতা, মিডিয়া, পেমেন্ট প্রসেসর, লজিস্টিক পার্টনারসহ সকলেই কমবেশি আক্রান্ত। ইভ্যালির সাথে সাথে অনিশ্চয়তা ছেয়ে এসেছে সবার উপর।

আমাদের দেশে যদি বিক্রেতা অধিকার সংরক্ষণ আইন বা পারতপক্ষে ই-কমার্স নীতিমালা থাকতো তাহলে ইভ্যালির সাথে সম্পৃক্ত হাজার হাজার কর্মচারী, ক্রেতা, বিক্রেতাসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের টাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। মানি লন্ডারিং এর অভিযোগ হতে পারতো ব্যাক্তি মোহাম্মদ রাসেল এবং শামীমা নাসরিন এর বিরুদ্ধে। প্রাতিষ্ঠানিক হিসেবগুলো থাকতো নিরাপদ, ইভ্যালির ব্যাবসায়ীক ক্ষতি হতো সীমিত।

তাছাড়া একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা মানে ওই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উপর ব্যাংকগুলো আস্থা হারাবে। ফলে প্রতিযোগীতায় ফিরে আসাটা সেই ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বাজারে সুষ্ঠ প্রতিযোগীতার পরিবেশ নষ্ট করার যে অভিযোগ আনা হলো, এই আইনী পদক্ষেপ সেই পরিবেশ কতটুকু সংরক্ষণ করলো সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

সরকার অতি দ্রুততার সাথে রাইড শেয়ারিং নীতিমালা প্রণয়ন করেছিল ফলে রাইড শেয়ারিং খাতে বিনিয়োগকারী এবং উপকারভোগী উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণ সম্ভব হয়েছিলো। ই-কমার্সের ক্ষেত্রেও এমন তড়িৎ পদক্ষেপ গ্রহণ অতি জরুরী।

 

                                           শেষ কথা

 

সেসময়ের মাইক্রোসফট এর বিপক্ষে হওয়া প্রতিযোগীতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ আমাদের আজকের ইন্টারনেট এপ্লিকেশন ব্যবহারের গতিপথ পুরোপুরি পাল্টে দিয়েছে। আশা করি আমাদের দেশেও ভালো কিছুই হবে। সম্ভাবনাময় এই খাত সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে। দিনশেষে ক্রেতাগণ লাভবান হবে সবার উপর। বেঁচে থাকুক দেশীয় প্রতিষ্ঠান